নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ২৭ ফেব্রুয়ারি:-ব্রিটেনের গবেষকদের দাবি, দেশটিতে ‘গেম অফ থ্রোনস’ ধারাবাহিকটি স্বাভাবিক যৌনমিলনের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা। মোদ্দা কথা, বিনোদনের নানা ক্ষেত্র যত বাড়ছে, যৌনেচ্ছা নাকি তত কমছে।নজর দেয়া যাক প্রতিবেশি দেশ ভারতের দিকে। কয়েক বছর আগে এক মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানির ক্যাম্পেনের বিষয়বস্তু ছিল, ভারতের মতো বিরাট জনসংখ্যা-জনঘনত্বের দেশের জনসংখ্যা কমানোর রাস্তা একটাই। জনগণকে আরও বেশি করে বিনোদনের মধ্যে নিমজ্জিত করে দাও। তারা খেলা দেখুক, সিনেমা দেখুক, ইউটিউবে শিলা কি জওয়ানি দেখুক, ভারচ্যুয়াল ক্লাবঘরে বসে তাস পিটুক— যা খুশি করুক, কিন্তু কোনও ভাবেই যেন একঘেয়েমিতে না ভোগে। কারণ একঘেয়েমি হলেই যৌন ইচ্ছে জন্মাবে। আর তা হলেই সন্তান। ওরে বাবা! জনসংখ্যা কমানোর দাওয়াই বটে!কিঞ্চিৎ চটুল বলে মনে হলেও, আসলে এই বিজ্ঞাপনে যৌনতা সম্পর্কে যে একটা সারসত্য বলা হয়, তা হাতেনাতে টের পাচ্ছে ইংল্যান্ড। জীবনে বিনোদনের কোনও সীমা নেই। তাই জীবন থেকে হাওয়া যৌনতা। আর যৌনতার সবচেয়ে বড় শত্রু, আর কেউ নয়, টেলিভিশন।কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড স্পিগেলহলটার সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যানমূলক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, গত ২০ বছরে ইংল্যান্ডে যৌনতার পরিমাণ কমে গিয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। আর তার মধ্যে চলতি বছরে যৌনতার পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। কিছু দিন ধরেই অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করছিলেন, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট-এর মতো ডিভাইসের কারণে যৌনতার প্রতি আকর্ষণ কমছে সারা পৃথিবীর মানুষের। এবার তার সঙ্গে টেলিভিশনের কারণে যুক্ত হয়েছে আরও একটি নাম— ‘গেম অফ থ্রোনস’। হ্যাঁ, জনপ্রিয় টেলিভিশন শো-টি।যদিও পরিসংখ্যানটি এখনও পর্যন্ত ইংল্যান্ড-নির্ভর, কিন্তু এর থেকে যে সারা পৃথিবীর অবস্থারই একটা মোটামুটি আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে, তা মানছেন অনেকেই। এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক স্পিগেলহলটার জানিয়েছেন, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা এখন স্মার্টফোনের কারণে এত সহজ হয়ে গিয়েছে যে, কেউ আর একঘেয়েমির শিকারই হচ্ছে না।গত কয়েক বছরে কতটা পাল্টেছে জীবন? জীবন থেকে যৌনতা কতটা হারিয়ে গিয়েছে? যৌনতার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিলেও বছর পঞ্চাশের অম্লান সরকারের মতে, ‘কয়েক বছর আগে, বিনোদন বলতে ছিল টেলিভিশন। রাত্রে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে চ্যানেলও বন্ধ হয়ে যেত। তখন কাছাকাছি থাকা মানুষটির সঙ্গে সময় কাটানো, কথা বলাই ছিল একমাত্র রাস্তা। যৌনতা কতটা কমেছে বলতে পারব না। তবে ইন্টারঅ্যাকশন-ই যদি কমে যায়, তাহলে শারীরিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা কমে বৈকি!’অধ্যাপক স্পিগেলহলটার-এর গবেষণা বলছে, এই গতিতে যদি যৌনতার পরিমাণ হ্রাস পায়, তাহলে অঙ্কের হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড থেকে যৌনতা লুপ্ত হয়ে যাবে। এবং অধ্যাপক এর জন্য আলাদা করে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ‘গেম অফ থ্রোনস’-কে। তাঁর মতে, অনেক গবেষকই স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, আইপ্যাড জাতীয় ডিভাইসকে দায়ী করছেন বটে। কিন্তু নেটফ্লিক্স-এর মতো পরিসেবা এসে যাওয়ার পর থেকেই মানুষ আরও বেশি করে যৌনতা বিমুখ হয়ে পড়ছেন।ট্যাবলেট বা আইপ্যাডের মতো ডিভাইস কি তাঁদের যৌনজীবনে প্রভাব ফেলেছে? এই প্রশ্নের কলকাতার বাসিন্দা বাঙালি-অবাঙালি দম্পতি অর্পিতা-পারিজাত বলছেন, এই জাতীয় ডিভাইস তাঁদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেও সাহায্য করে। তাই তাঁদের সম্পর্ক এই অত্যাধুনিক ডিভাইসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন না। কিন্তু যৌনতার প্রশ্নে সরাসরি উত্তর দিতে তাঁরা নারাজ। ৭-৮ বছর বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ এই দম্পতির দু’জনেই অবশ্য এটা মেনে নিচ্ছেন, স্মার্টফোনের রমারমার পর থেকে নিজেদের মতো করে গল্প করার পরিমাণ আগের চেয়ে কমে গিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ সালে ব্রিটিশ ‘কাপল’-রা গড়ে মাসে পাঁচ বারের মতো সঙ্গম করতেন। ২০০০ সালে তা কমে এসে দাঁড়ায় গড়ে মাসে চার বার। ২০১০ সালে তা হয়েছে তিন বার। ‘গেম অফ থ্রোনস’-এর মতো ‘এনগেজিং’ টেলিভিশন শো-এর রমারমার পর থেকে মাসে গড়ে সঙ্গমের পরিমাণ হুহু করে পড়ছে বলেও মনে করছেন অধ্যাপক স্পিগেলহলটার।এই জাতীয় টেলিভিশন শো সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে ভারতেও। কী বলছেন কলকাতার দম্পতিরা, যাঁরা টেলিভিশন বা অনলাইনে এই জাতীয় শো নিয়মিত দেখেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দম্পতির পুরুষটি যদিও বলছেন, তাঁদের সর্ম্পকের মধ্যে কোনও পরিবর্তনই নিয়ে আসেনি এই জাতীয় শো-এর প্রতি তাঁদের অ্যাডিকশন। মজার কথা এটাই যে, তাঁর সঙ্গিনী কিন্তু বলছেন, বহু রাত্রি এমন যায়, যেখানে তাঁরা পরস্পরকে সময় দিতেই পারতেন, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বাড়ি ফিরে নিয়ম করে টেলিভিশন শো দেখতে বসার উদগ্র বাসনার কারণে তা তাঁরা পরস্পরকে দিয়ে উঠতে পারেন না।
No comments:
Post a Comment